বৃদ্ধদের টিভি ঠিক করে বছরে ১০ লাখ টাকা আয়: ৯৯% মানুষ যে ব্যবসাকে অবহেলা করে

লক্ষ লক্ষ বৃদ্ধ একটি টিভির কাছে বন্দী, কেউ কেউ ইতিমধ্যে টাকা কামাচ্ছে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব বলছে, ৬০ বছরের বেশি মানুষের সংখ্যা এখন ১.৫ কোটির বেশি। আর টেলিভিশন দেখার প্রধান দর্শকই এই বয়স্করা—বিশেষ করে গ্রাম ও ছোট শহরে।

অথচ এই মানুষগুলোর কাছেই স্মার্ট টিভি সবচেয়ে জটিল।

টিভি চালু করলেই প্রথমে বিজ্ঞাপন, তারপর হোম স্ক্রিনে অজস্র মেনু। খবর দেখতে চাইলে পাঁচটা ধাপ পেরোতে হয়, ভুল বাটন চাপলে সাবস্ক্রিপশন পেজে আটকে যায়, বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পায় না। ছেলেমেয়ে বিদেশে বা শহরে, বাবা-মা একা। রিমোট হাতে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই।

এটা কোনো একটি পরিবারের সমস্যা না। প্রতিদিন লাখ লাখ ঘরে এই দৃশ্য ঘটছে। আর প্রতিটি আটকে পড়া বৃদ্ধের পেছনে আছে এমন একজন সন্তান, যে সমস্যা সমাধানের জন্য টাকা দিতে প্রস্তুত।

বাসায় গিয়ে টিভি ঠিক করে দেওয়ার চার্জ সাধারণত ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। লোকাল সার্ভিস হিসেবে এটা খুব বেশি না, কিন্তু রিপিট অর্ডার আর রেফারেল আসে অবিশ্বাস্য হারে। একটা পাড়ায় একজন বৃদ্ধের মন জিততে পারলে, পুরো মসজিদ-মাঠ-ক্লাব সবাই আপনার নাম জানবে।

কেন এই ব্যবসায় কেউ আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করবে না

তরুণরা ভাবে, টিভিতে সফটওয়্যার বসানো আবার কী এমন কঠিন—নিজেই পাঁচ মিনিটে করে ফেলে। সমস্যা হলো: আপনি তো বাবা-মায়ের পাশে থাকেন না। আপনার কাছে পাঁচ মিনিটের কাজ, তাদের কাছে অসম্ভব এক দেয়াল।

ব্র্যান্ডের অফিসিয়াল সার্ভিসও কাজের না। তারা টিভির মেনু ঠিক করে দেবে, কিন্তু থার্ড-পার্টি অ্যাপ বসানো, বিজ্ঞাপন বন্ধ করা, সাবস্ক্রিপশন ফাঁদ থেকে বের করা—এসব তারা করবে না। অফিসিয়ালি যা করার অনুমতি নেই, সেটাই বৃদ্ধদের সবচেয়ে দরকার।

ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোও সমস্যা সমাধানে আগ্রহী না। টিভিতে সাবস্ক্রিপশন ফি মোবাইলের চেয়ে অনেক বেশি, প্ল্যাটফর্ম আর হার্ডওয়্যার কোম্পানি সবাই ভাগ পায়। কেউ চায় না জিনিসটা সহজ হোক। বৃদ্ধরা “একটার পর একটা ফি”র ফাঁদে আটকে থাকে, প্রিয় নাটকটা সবসময় পেওয়ালের ওপারে।

বাজারে আজ পর্যন্ত এমন কোনো টিভি আসেনি যেটা চালু করলেই সরাসরি খবর বা নাটক চলে। বড় কোম্পানিগুলো বানাতে চায় না, ছোটরা পারেও না। চাহিদাটা ঠিক এভাবেই ঝুলে আছে।

৩০০ টাকার এক অর্ডার থেকে দিনে ৩০০ অর্ডারের রাস্তা

এক তরুণ ইলেকট্রনিক্স দোকানে কাজ শুরু করে, তিন মাস পর নিজেই ব্যবসা খোলে, আর গত ঈদে তার টিম দিনে ৩০০+ অর্ডার হ্যান্ডেল করেছে। সংখ্যাটা যাচাই করা সম্ভব না, কিন্তু গ্রোথের পেছনের স্ট্র্যাটেজি কপি করা যায়।

প্রথমে সে দোকানের চাকরির সুবাদে কাস্টমার জমায়। প্রতিদিন যারা নতুন টিভি কিনতে আসে বা মেরামত করাতে আসে, তাদের টিভি সেটআপ করে দেয়, একটা হাতে লেখা গাইড দেয়, আর মোবাইল নম্বর রেখে দেয়। এক মাসে তার কাছে কয়েক ডজন সরাসরি কাস্টমার। এই মানুষগুলো অনলাইনে সার্চ করে না, কিন্তু পাড়ার সবাইকে বলে বেড়ায়।

তারপর এককালীন সার্ভিসকে নিয়মিত সার্ভিসে বদলায়। আজ টিভি ঠিক করে দিলে, সিস্টেম আপডেটের পর আবার গোলমাল হবে। আজকের ইনস্টল করা অ্যাপ, নাতি এসে নষ্ট করে যাবে। ৩০০-৫০০ টাকার ভিজিট তো শুধু এন্ট্রি টিকিট। আসল আয় আসে রিমোট সাপোর্ট আর নিয়মিত ভিজিট থেকে। ফোনে বা ভিডিও কলে সমস্যা সমাধান করে দিলে ১০০-১৫০ টাকা নেওয়া যায়, খরচ প্রায় শূন্য।

বাল্ক কাস্টমার আসে কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ কমিটি, ক্লাবের সাথে কাজ করলে। “স্মার্ট টিভি ব্যবহার শেখার ফ্রি ওয়ার্কশপ” করলে সেখান থেকেই ১৫-২০টা হোম ভিজিটের অর্ডার পাওয়া যায়। ওয়ার্কশপ ফ্রি, কিন্তু “বাসায় গিয়ে হাতে-কলমে শেখানো” চার্জড। কনভার্সন রেট অসাধারণ।

টিম বাড়ানোর লজিকও সোজা: হোম সার্ভিস লোকাল কাজ, একটা এলাকায় ২-৩ জন যথেষ্ট। রিমোট সাপোর্ট সেন্ট্রালি করা যায়, একজন মানুষ একসাথে ৪-৫টা কল হ্যান্ডেল করতে পারে। ঈদ বা পূজার ছুটিতে অর্ডার বাড়ে—ছেলেমেয়ে বাসায় এসে দেখে টিভি চলে না, তখনই ফোন আসে।

আয়ের সীমা কোথায়: সার্ভিস চার্জের বাইরে দ্বিতীয় রাস্তা

ওই তরুণ গত বছর নাকি ২৩ লাখ টাকা আয় করেছে—৬০% সার্ভিস ফি থেকে, বাকিটা ভিডিও প্ল্যাটফর্মের সাথে কমিশন ডিল থেকে। সংখ্যাটা যাচাই করা যায় না, কিন্তু কমিশন মডেলটা বাস্তব।

ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো টিভি হার্ডওয়্যারে প্রি-ইনস্টল থাকে। একজন বৃদ্ধ যখন প্রথমবার সাবস্ক্রিপশন কেনে, হার্ডওয়্যার কোম্পানি কমিশন পায়। আপনার সার্ভিস টিম আসলে প্ল্যাটফর্মের জন্য নীরব কাস্টমার অ্যাক্টিভেট করছে। যে বৃদ্ধ কখনো সাবস্ক্রিপশন কেনেনি, আপনার সেটআপের পর নিয়মিত পেমেন্ট করা শুরু করল—এই কাস্টমারের ভ্যালু দীর্ঘমেয়াদি। এই লজিক নিয়ে প্ল্যাটফর্মের লোকাল ডিস্ট্রিবিউটরের সাথে কথা বলুন, CPS কমিশন (আপনার মাধ্যমে পেমেন্ট করা প্রতিটি কাস্টমারের জন্য টাকা) পাওয়া অসম্ভব না।

আরও বড় সুযোগ হার্ডওয়্যারে। “এক বাটনে টিভি চালু” করার মতো একটা সিম্পল বক্স বানানোর কথা ভাবা হচ্ছে, ইনভেস্টরও নাকি পাওয়া গেছে। এটাও যাচাই করা যায় না, তবে দিকটা সঠিক—বাজারে “বয়স্ক-বান্ধব টিভি এক্সপেরিয়েন্স” নিয়ে সত্যিই আগ্রহ আছে।

সাধারণ মানুষের হার্ডওয়্যার বানাতে যাওয়ার দরকার নেই। সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে কয়েক হাজার বৃদ্ধ কাস্টমার জমিয়ে ফেলুন। তখন আপনার হাতে থাকবে একটা প্রিমিয়াম সিলভার অডিয়েন্স। ওষুধ কোম্পানি বা হেলথ প্রোডাক্ট বিক্রেতারা একটা বয়স্ক লিডের জন্য মোটা টাকা দেয়। আপনার কাছে হাজার হাজার বিশ্বস্ত কাস্টমার—এই অ্যাসেটের দাম সার্ভিস ফির চেয়ে অনেক বেশি।

কীভাবে শুরু করবেন: তিনটা রাস্তা আজই খোলা

রাস্তা এক: ফেসবুক মার্কেটপ্লেস + লোকাল হোম সার্ভিস। ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে “বয়স্কদের জন্য টিভি সেটআপ/সফটওয়্যার ইনস্টল/বিজ্ঞাপন বন্ধ” সার্ভিস পোস্ট করুন, দাম ৩০০-৮০০ টাকা, লোকেশন নির্দিষ্ট করুন। “টিভিতে বিজ্ঞাপন আসে কেন” বা “সাবস্ক্রিপশন বন্ধ করব কীভাবে”—এই ধরনের পোস্টের কমেন্টে মানুষ হেল্প চায়। সেখানে আন্তরিকভাবে উত্তর দিন, ইনবক্সে কাজের রিকোয়েস্ট আসবেই। একটা ভিজিট ৩০০-৫০০ টাকা, দিনে ৪-৫টা করলে মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা সহজ।

রাস্তা দুই: ইউটিউব শর্টস + রিমোট সাপোর্ট। “বাবা-মায়ের টিভি ৩ মিনিটে ঠিক করুন” বা “টিভিতে খবর চালু করার সহজ উপায়” ভিডিও বানান। প্রতিটা ভিডিওর শেষে বলুন: “নিজে করতে না পারলে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করুন, ভিডিও কলে ঠিক করে দেব।” আপনার টার্গেট অডিয়েন্স বৃদ্ধ না, তাদের সন্তানেরা—যারা শহরে বা বিদেশে থাকে। তারা ভিডিও দেখে প্রথমে বাবা-মাকে পাঠাবে, তারপর সরাসরি আপনাকে কাজ দেবে। রিমোট সাপোর্ট ১০০-২০০ টাকা, ভলিউম বেশি, কোনো এলাকার সীমাবদ্ধতা নেই।

রাস্তা তিন: কমিউনিটি বাল্ক সার্ভিস। মসজিদ কমিটি বা হাউজিং সোসাইটির সাথে কথা বলুন। পাড়ায় “ফ্রি টিভি চেকআপ ক্যাম্প” করুন। ছোট সমস্যা ঘটনাস্থলেই ঠিক করে দিন, বড় সমস্যার জন্য হোম ভিজিট বুক করুন। একটা পাড়া থেকে ২০-৩০টা পেইড কাস্টমার পাওয়া যাবে। কাজ শেষে কমিটির লোককে দিয়ে গ্রুপে একটা প্রশংসা পোস্ট করান, পরের পাড়ার দরজা নিজে থেকেই খুলবে।

শুরুতে ফুল-টাইম ঝাঁপিয়ে পড়ার দরকার নেই। সপ্তাহে দুইদিন ছুটিতে ২-৩টা হোম ভিজিট করুন, ইউটিউবে ২-৩টা ভিডিও দিন। রিমোট সাপোর্টের জন্য শুধু একটা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট লাগে, খরচ প্রায় শূন্য। যখন দেখবেন রিমোট অর্ডার দিনে ৩-৪টা নিয়মিত আসছে, তখন ফুল-টাইম করার কথা ভাবুন। আর একজন বন্ধুকে সাথে নিন—একজন ফিল্ডে, একজন রিমোটে। সময় আর আয় দুটোই হিসাবের মধ্যে থাকবে।

এই ব্যবসার আসল দেয়াল: বিশ্বাস, টেকনিক্যাল স্কিল না

টিভিতে সফটওয়্যার বসানো কঠিন কাজ না। কিন্তু বৃদ্ধরা আপনাকে টাকা দেবে না এই কারণে যে আপনি টেকনিক্যালি ভালো। তারা টাকা দেয় এই কারণে যে আপনি ধৈর্যশীল, বিশ্বস্ত, আর যখন দরকার তখন ফোন ধরেন।

এক বৃদ্ধ শিক্ষক কেন ৫০০ টাকার কাজে ১০০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে পুরো পাড়ায় রেকমেন্ড করলেন? টেকনিক্যাল স্কিলের জন্য না। কারণ ওই তরুণ দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে সব সেটিংস গুছিয়ে দিয়েছে, হাতে লেখা সহজ গাইড বানিয়ে দিয়েছে। এই ধৈর্য কোনো অ্যাপ বা টিউটোরিয়াল দিতে পারে না।

তরুণরা ভাবে কাজটা ছোট। কিন্তু “ছোট” মানেই: কম প্রতিযোগিতা, কম মার্কেটিং খরচ, বেশি কাস্টমার লয়ালটি। একবার একজন বৃদ্ধ আপনাকে বিশ্বাস করলে, তার সব ডিজিটাল সমস্যার জন্য আপনাকেই ডাকবে—ফোন চলে না, রাউটার কানেক্ট হয় না, সিসিটিভি দেখা যায় না। টিভি ঠিক করা শুধু ঢোকার দরজা, পেছনে আছে পুরো পরিবারের চলমান সার্ভিসের চাহিদা।

অবসরপ্রাপ্ত ইলেকট্রিশিয়ানদের পার্টনার বানানোর আইডিয়াটাও দারুণ। তারা বেসিক ইলেকট্রনিক্স বোঝে, বৃদ্ধদের সাথে বয়সের মিল আছে, যোগাযোগে সমস্যা হয় না, সময়ও আছে। তাদের ট্রেনিং দিয়ে স্ট্যান্ডার্ড সার্ভিস প্রোভাইডার বানান, আপনি ম্যানেজমেন্ট ফি আর ব্র্যান্ড ভ্যালু নিন, তারা শ্রমের টাকা পাক। দুজনেরই লাভ।

বাজারটা বিশাল। দেড় কোটির বেশি বৃদ্ধ, তার এক শতাংশও যদি আপনার কাস্টমার হয়, সেটা দেড় লাখ মানুষ। একা কাজ করলে মাসে ৫০ হাজার টাকা কোনো ব্যাপারই না। ছোট একটা টিম বানালে বছরে ১০ লাখ টাকা অসম্ভব কিছু না। আজই ফেসবুক মার্কেটপ্লেস খুলুন, প্রথম পোস্টটা দিন—“বয়স্কদের জন্য টিভি সেটআপ সার্ভিস, ৩০০ টাকা”। আজ রাতেই প্রথম কল আসবে।